দ্য রেভেন্যান্ট – আসন্নমৃত্যু থেকে বেঁচে উঠা

“সব ঠিক আছে, পুত্র। আমি জানি তুমি চাও এর শেষ হোক। আমি এখানেই আছি। আমি এইখানেই থাকবো। কিন্তু তুমি হাল ছেড়ে দিও না। শুনতে পাচ্ছো? যতক্ষণ পর্যন্ত শ্বাস নিতে পারবে, তুমি লড়ে যাও। শ্বাস নাও… নিতে থাকো”– এক স্বপ্নের মধ্য দিয়ে ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ ছবির পর্দা উঠে। স্বপ্নের কয়েক দৃশ্যে ‘হিউ গ্লাস’ এর নেপথ্য কণ্ঠে ভেসে আসা গুটিকয় শব্দেই (পুত্র, শ্বাস, আমি আছি, লড়াই) যেন পুরো ছবির আত্ম-গরিমা নিহিত। সেই স্বপ্নানুভূতির ঘুম ভাঙে প্লাবিত কোন এক বুনো অঞ্চলের হিম শীতল জলের স্রোতের শব্দে। হিংস্র বন্যজন্তু, শত্রুপক্ষ আরিকারাদের অতর্কিত আক্রমণ, প্রকৃতির নির্মমতা– মিলে আমেরিকার মন্টানার এ বুনো অঞ্চল যেন এক মৃত্যু উপত্যকা! ১৮২৩ এর কোন সময়ে এমনই এক মৃত্যু উপত্যকা থেকে পশম শিকারী হিউ গ্লাসের জীবন-সংগ্রাম নিয়েই দ্য রেভেন্যান্ট ছবির বেড়ে উঠা।

ছবির বিষয়বস্তু ছকে বাঁধা হওয়া সত্ত্বেও এর দৃষ্টিকোণ আপেক্ষিক এবং প্রভাব বিস্তৃত। ছবিটা যেমন বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে তেমনি আবার এটি সম্পর্কের ছবি, প্রতিশোধের ছবিও।

বৈরী আবহাওয়া থেকে বাঁচতে পশমের খোঁজে পশম শিকারীদের এক দল মন্টানা অঞ্চলে তাবু গেড়েছে। অন্যদিকে আরিকারা দলপতির মেয়ের নিখোঁজে তাদের মাথায় রক্ত সওয়ার। তারই প্রেক্ষিতে আরিকারাদের (আমেরিকান আদিবাসী) আকস্মিক আক্রমণের প্রস্তুতিবিহীন লড়াই শেষে শিকারীদের দলটি যখন নৌকা করে পালাচ্ছে ততক্ষণে দলের ৩৩ জন মৃত! পরিস্থিতি যখন শান্ত, আগুনের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আকাশ তখন যেন মৃত্যু আর লড়াইয়ের ভয়াবহতার প্রমাণ দিচ্ছিল ।

যাত্রার শুরু থেকেই ‘হিউ গ্লাস’ এর দলেরই একজন তার সব কথার বিরোধিতা করে আসছিল, গ্লাস তখনও অতটা ভাবেনি যে তার দুর্গম যাত্রায় ক্রমেই আরেকটি বাধা তৈরি হয়ে যাচ্ছে– তিনি ‘জন ফিটজেরাল্ড’। ফিটজের সমস্যা হিউ গ্লাসের অর্ধ-আদিবাসী পুত্রকে নিয়ে। একে তো সে অন্য গোত্রের, যাদের সাথে রয়েছে তাদের জাতিগত সমস্যা উল্টো এখন যাত্রাপথে তাকে বয়ে নিতে হচ্ছে। কিন্তু এবারে ফিটজ তার বাদানুবাদ লম্বা করতে পারেনি। কারণ দুর্গম এ পথের একমাত্র পথ প্রদর্শক ওই হিউ গ্লাসই। ছবির এ পর্যায়ে এসে গল্প কাঙ্ক্ষিত মোড় নেয়, যখন গ্লাস দলকে রেখে একা পশম শিকারে বের হয়।

হঠাৎ ধেয়ে আসা ভাল্লুকের করাল থাবায় গ্লাস নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পেল ছিন্নবিচ্ছিন্ন অবস্থায়। ক্ষতবিক্ষত দেহ মৃত্যু যন্ত্রণাকে তীব্র করে তুলছে। ভাল্লুকের সাথে গ্লাসের এ লড়াইয়ের বাস্তবিক উপস্থাপন মনে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। এমতাবস্থায় মৃতপ্রায় সঙ্গীর সঙ্গ ছাড়ে তার দল। অবস্থার সুযোগ নেয় ফিটজ, হত্যা করে গ্লাসের পুত্রকে, জীবন্ত কবর দেয় গ্লাসকে। এ পর্যায়ে চিত্রনাট্যের ব্যবচ্ছেদ হয় দু’অংশে। এক অংশ জানায় গ্লাসকে আসন্নমৃত্যু থেকে বেঁচে উঠার আদিম ইচ্ছাকে জাগ্রত করতে হবে— যা কেবল ছবির বিশদ অংশই নয় বরং ছবির নামকরণের সার্থকতা প্রকাশ করে। অন্য অংশে, চোখের সামনে নিজ সন্তানের মৃত্যু এবং তাকে বাঁচাতে না পারার অসহনীয় কষ্ট রূপ নেয় প্রতিশোধে।

The.Revenant.2015.720p.BRRip.1.4GB.MkvCage[(076223)10-05-03]
আসন্নমৃত্যু অবস্থা থেকে প্রত্যাবর্তন

ছবির ‘প্রতিশোধ অংশ’ দেখানোর উদ্দেশ্য কেবলই ছবিকে এগিয়ে নেয়া। নয়তো বৃহৎ অর্থে পুরো ছবিতে ইনারিতু মানুষের সাথে প্রকৃতির লড়াই দেখিয়েছেন এবং এও বুঝিয়েছেন যে আমরা আর-দশটা প্রজাতির মতোই প্রকৃতির এক অংশ, যে এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে।

চিত্রনাট্যকে তো ক্যামেরাভাষায় অনূদিত হয়ে চলচ্চিত্র হতে হয়; ঠিক তদরূপ দৃশ্যকেও কখনো অনুবাদ করতে হয় শব্দহীনতায়। আমরা এক দৃশ্যে দেখতে পাই গ্লাস তার মৃত পুত্রের বুকে মাথা রেখে ক্রন্দনরত হয়ে বলছে, “আমি তোমার সঙ্গ ছাড়িনি পুত্র, আমি এখানেই আছি”— এই দুই বাক্যে আবেগ এতই তীক্ষ্ণভাবে উঠে আসে যে শব্দের আর প্রয়োজন পড়ে না। ওই একই দৃশ্যে দেখা যায় গ্লাস জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে আর মুখ থেকে বের হচ্ছে ধোঁয়া। ঠিক পরের দৃশ্যেই দেখতে পাই আকাশ থেকে ধোঁয়ার মতো ভেসে আসছে মেঘ এবং ভয়েস ওভারে শোনা যায় শ্বাস নেয়ার শব্দ। এই ‘ধোঁয়া’ এবং ‘শ্বাসের শব্দ’ একযোগে শোনা ও দেখার মধ্য দিয়ে দুটি ভিন্ন দৃশ্য যেন এক সুতোয় গেঁথে গেল।

The.Revenant.2015.720p.BRRip.1.4GB.MkvCage[(058288)10-23-45]
দৃশ্যপটে গ্লাসের মৃত স্ত্রীর বার বার ফিরে আসা

তীব্র কষ্টের মুহূর্তে গ্লাসের দৃশ্যপটে বার বার ফিরে আসছিল তার মৃত স্ত্রী, যেন দৃশ্য কয়েক পর পর ইনারিতু আমাদের আবেগীয় স্বস্তি দিচ্ছেন। সেসব মুহূর্তে চিত্রগ্রাহক ইমানুয়েল লুবেজকি দৃশ্যের গতি টেনে ধরতে চাইলেন। তাতে করে দৃশ্য এগোয় ধীর লয়ে, মনে ভিড় করে স্বর্গীয় প্রশান্তি। আবার এক স্বপ্নদৃশ্যে দেখা যায় প্রাচীন দুই প্রাচীরের মধ্য দিয়ে গ্লাস হেঁটে যাচ্ছে– এটি তারকোভস্কির ‘নস্টালজিয়া’ ছবির একটি দৃশ্যকে মনে করায়। ‘মৃতদেহের বক্ষচ্ছেদ হতে পাখির উড়ে যাওয়া’, ‘ভয়ার্ত নারীর মুখ’, ‘দূরে কোথাও আগুন জ্বলছে’, ‘আত্মহত্যা’– এমন প্রতি দৃশ্যেই তারকোভস্কি-ফ্রেমের উল্লেখ যেন ইনারিতুর গুরু দক্ষিণা।

হিউ গ্লাসের চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতে সম্ভবপর কোন কসরত করতে বাকি রাখেননি লিওনার্দো। কিন্তু এসবকে ছাপিয়ে যায় তার অভিব্যক্তি। শব্দহীন দৃশ্যে তাকে ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে দৃশ্যের গতিপথ। পুত্র হারানোর যন্ত্রণা বা অসহায় ক্ষুধার্ত মুখের চাহনি– নির্দিষ্ট কোন দৃশ্যের অভিব্যক্তিতে তাকে আটকে রাখা দুরূহ বটে। আর তাই পর্দার প্রতি ইঞ্চি লিওনার্দো গুণগানেই যেন ব্যস্ত।

রেভেন্যান্ট বেঁচে থাকার মহাকাব্য বয়ান করে। বাঁচার পরম উদ্দীপনা ধ্বনি তুলে— ‘লড়ে যা, লড়ে যা! জীবন একটাই’। মনের গহীনে নিভু নিভু আশার আলোক দীপরেখা তখন ক্রমে ক্রমে জেগে উঠে।


the-revenant-TheRevenant_LeoPoster_rgb

The Revenant (2015)
● Running time: 156 min ● Release date: 16 December 2015 ● Color: Color ● Country: United States ● Language: English ● Genre: Adventure/Spiritual Drama/Thriller ● Producer: Arnon Milchan, Steve Golin, Alejandro G. Iñárritu, Mary Parent, Keith Redmon, James W. Skotchdopole ● Cinematographer: Emmanuel Lubezki ● Editor: Stephen Mirrione ● Production Designer: Jack Fisk ● Music: Ryuichi Sakamoto, Alva Noto ● Screenplay: Mark L. Smith, Alejandro G. Iñárritu ● Novel: ‘The Revenant’ by Michael Punke ● Cast: Leonardo DiCaprio, Tom Hardy, Domhnall Gleeson, Forrest Goodluck, Will Poulter ● Director: Alejandro G. Iñárritu


এই লেখাটি মূলত আমার সিনে-লয়েড বইতে প্রকাশিত হয়েছিল। শুধুমাত্র এই সাইটের পাঠকের জন্য লেখাটি এখানে প্রকাশ করা হল। লেখকের অনুমতি ব্যতীত অন্য কোথাও এটি প্রকাশ করা যাবে না।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s