দ্য ফাউন্টেন – জ্ঞানবৃক্ষে বন্দী জীবন-সন্ধি

একটা বৃত্ত-বিম্ব মেঘ হয়ে মহাশূন্যে কাঁচন হলদেবর্ণে ভেসে যাচ্ছে। ওই বৃত্তে বন্দী ‘জীবনবৃক্ষ’। জীবনবৃক্ষে বন্দী অমরত্বের সন্ধান। কিন্তু ‘ইযি’ বলেছিল, মায়ানরা বিশ্বাস করতো আকাশে জ্বলে উঠা স্বর্ণরূপ ধারণ করা ‘সিবাবা’ (মৃতপ্রায় নক্ষত্র) কিছুদিন পরই বিস্ফোরিত হবে, সেখানে জন্ম হবে নতুন নক্ষত্রের। একটির পরিত্রাণ হবে অন্যটির অবস্থান।

ফাউন্টেনের বিশ্লেষণ নিছক গল্পসর্বস্ব নয়, অভিজ্ঞতাও। তিনটি সময়ের পরিক্রমায় জন্ম, মৃত্যু, পুনর্জন্ম ও ভালোবাসার এ আখ্যান বিস্তৃত হয়েছে সহস্র বছরে! নন-লিনিয়ার কাহিনীধারায় বিন্যস্ত এ ছবির অবস্থান কখনো ষোড়শ শতাব্দীর অতীতে— মায়ান সভ্যতার অন্ধকার কোন এক জঙ্গলে। কখনো একবিংশ শতাব্দীর এই বর্তমানে। আবার কখনো পাঁচশ বছর পরের ভবিষ্যতে, যেখানে মহাশূন্যে সৃষ্ট হয়েছে ইন্দ্রজাল-বিম্বের মতো বেষ্টিত জীবমন্ডল। বর্তমানের ‘টম’ একমাত্র ‘বাস্তব’ চরিত্র যাকে কেন্দ্র করে গল্পের আবর্তন অতীত ও ভবিষ্যতে। টমের অবশিষ্ট দুই সত্তা যথাক্রমে ‘টমাস’ ও ‘টমি’ মূলত ইযির উপন্যাসের নায়ক। যে উপন্যাসের শেষ অধ্যায় অলিখিত হয়ে আছে, যা সম্পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি টম ইযিকে দিয়েছে। আমরা দেখি তিন গল্পের এক যোগসূত্রে ভিন্নরূপে টম তার ভালোবাসা ইযিকে বাঁচানোর প্রাণান্তর চেষ্টা করছে।

still-of-rachel-weisz-and-hugh-jackman-in-the-fountain-(2006)

বর্তমানে সে একজন চিকিৎসক যে জীবনের অন্তর্লীন সত্যকে অগ্রাহ্য করে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত স্ত্রী ইযিকে সুস্থ করে তুলতে দিবারাত্র ল্যাবে গবেষণারত। ষোড়শ শতাব্দীতে সে স্পেনের রানী ‘ইসাবেল’কে কথা দিয়েছে মায়ান পৌরাণিকে বর্ণিত গুপ্ত পিরামিডের সন্ধান দিবে। সন্ধান দিবে অমরত্ব লাভের গুপ্ত জীবনবৃক্ষের। ভবিষ্যতে ইযি রূপান্তরিত হয় ‘বৃক্ষে’। এবারও টমি তার প্রতিজ্ঞায় অনড়। আশায় জর্জরিত দীর্ঘ স্মৃতি চিহ্নের ঠাঁই হয়েছে তার বাহুদ্বয়ে। নেপথ্যে, মৃদুস্বরে পুনরায় ফিরে আসে, ভেসে আসে একই স্বর ‘শেষ করো’।

ম্যাথু লিবাটিকের চিত্রধারণ যেন কুব্রিকীও স্পর্শে রঞ্জিত! মহাশূন্য যেন এক ক্যানভাস আর তাতে  বিচ্ছুরিত হয়েছে কনফিডেন্ট ব্রাশস্ট্রোকস! ছবির এক পর্যায়ে দেখা যায় একটি ‘হাই-অ্যাঙ্গেল শটে’ জীবনবৃক্ষের বিম্ব বৃত্তাকারে ঘুরছে, তদরূপ পরের দৃশ্যেই হাসপাতালে চিন্তিত টমকে দেখা যায় মাথায় হাত রেখে বৃত্ত ধরে হাঁটতে। ‘অমরত্বের ভাবনা’ দৃশ্যদ্বয়কে অভিন্ন করে দেয়। আবার আপাত নিস্ফল গবেষণায় বিরক্ত টম যখন ইযিকে দেখতে হাসপাতালে প্রবেশ করে, সোডিয়াম আলোতে চেহারায় পড়া আলো-আঁধারের পরিবর্তন ‘ক্লোজ আপ’ শটে তার মনের অস্থিরতাকে প্রকাশ করে। ফ্রেমের এমন কম্পোজিশন দর্শকের দৃষ্টিকে আরও আকৃষ্ট করতে থাকে।

এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম কোন এক অনিশ্চিত কারণে অ্যারোনফস্কি অধিকাংশ ছবিতে ‘অন্ধকারময় বিষয়’ বেছে নেন। বেশিরভাগ ছবিতেই তিনি ফলাফল নির্ধারণের পথে হাঁটেন না বরং ব্যাখ্যার পথ উন্মুক্ত করে দেন। তার কথা মতেই, ছবিটি অনেকটা রুবিক কিউবের মতো। এর সমাধানের পথ অনেক হতে পারে কিন্তু পরিণতি কেবল একটাই। পুরো ছবিতে অ্যারোনফস্কি গদ্য বর্ণনার বদলে আলোকচিত্রের অন্ত্যমিলে কাব্যিক ভাষা ও দৃষ্টিনন্দন উপমা দিতে চেয়েছেন। যথার্থ আবহ সংগীতের ব্যবহার যেন সেই ভাষাকেই ত্বরান্বিত করেছে। দেখিয়েছেন বিমূর্ত জগতের সাথে মূর্তের সংযোগ। পরিচালক তার কেন্দ্রীয় দুই চরিত্রে দিয়েছেন অনুভূতির গভীরতা। হিউ জ্যাকম্যান ও রাচেল ভাইজ তাতে ব্যক্তি ও যুগ্ম বলয়ে কেবল দ্যুতিই ছড়িয়েছেন। রাচেলের অভিব্যক্তি ও নমনীয়তা আমাদের সহজেই টেনে নেয় ‘ইযি’ চরিত্রের গভীরে। যন্ত্রণা, হতাশা, একাগ্রতা বা অন্তরঙ্গতা– অনুভূতির প্রায় সব আকৃতিতে জ্যাকম্যানকে পাওয়া যায় যথার্থরূপে।

Fountain-Desktop-Wallpapers-HD

গবেষণার রুমে ব্যস্ত টম। দরজায় দাঁড়িয়ে ইযি। তুষারপাতের আজ প্রথম দিন। ইযির আবদার, চলো একসাথে হেঁটে বেড়াই। কাজের অজুহাতে টমের উপেক্ষা। ইযির প্রস্থান।

সৃষ্টির প্রারম্ভেই মানব জাতি জীবনবৃক্ষের পরিবর্তে জ্ঞানবৃক্ষ আস্বাদন করলো। সময়ের পরম্পরায় মানুষের জ্ঞানের পরিধি বাড়লো। জ্ঞানকে ব্যবহার করলো ব্যস্ততায়, বেঁচে থাকার নিত্যনতুন আবিষ্কারে। ভুলে গেল বাঁচতে, ভালোবাসতে! পরিণামে মৃত্যু হলো বিয়োগ! হলো কষ্ট! এই বৈপরীত্যে, জ্ঞানে বিকশিত যখন ভালোবাসা, মৃত্যুও তখন বশীভূত!

ইযির প্রস্থানে টম এবার ভুল করেনি। শুভ্র তুষারপাতে ইযির পথ ধরে দৌড়ে যাচ্ছে, মৃত বৃক্ষ বেয়ে বিম্ব পেরিয়ে সিবাবার ধ্বংসস্তুপে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, মায়ানদের পরাজিত করে জীবনবৃক্ষের স্পর্শে এগিয়ে যাচ্ছে।


the_fountain_dvd_art_ii_by_drdyson

The Fountain (2006)
● Running time:
96 min ● Release date: 22 November 2006 ● Color: Color ● Country: United States ● Language: English ● Genre: Drama/Romance/Sci-fi ● Producer: Arnon Milchan, Iain Smith, Eric Watson ● Cinematographer: Matthew Libatique asc ● Editor: Jay Rabinowitz ace ● Production Designer: James Chinlund ● Visual Effects Design: Dan Schrecker, Jeremy Dawson ● Music: Clint Mansell ● Story: Darren Aronofsky, Ari Handel ● Screenplay: Darren Aronofsky ● Cast: Hugh Jackman, Rachel Weisz, Ellen Burstyn ● Director: Darren Aronofsky


এই লেখাটি মূলত প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাংলামেইল২৪ ডট কম’ অনলাইন পত্রিকার জন্য। সেই লেখা পড়তে যেতে হবে এই লিংকেপরবর্তীতে ‘রাশপ্রিন্ট’ ওয়েবপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পড়ুন এই লিংকে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s