এ আর রহমানের অস্কার যাত্রা

দিল হ্যায় ছোটা সা’ গানটি ছাড়া ‘রোজা’র সুপ্ত মনের বাসনাকে কি অমন করে ব্যক্ত করা যেতো? বা ‘মোহন’ এর স্বদেশে ফেরার ব্যগ্রতাকে কি অতটা অনুভব করতে পারতাম যদি না নেপথ্যে ‘ইয়ে যো দেশ হ্যায় তেরা’ গানটি বেজে উঠতো? কিংবা ‘শেখর’ যদি বেকাল ফোর্টে দাঁড়িয়ে প্রেয়সীর তরে ‘তু হি রে’ গেয়ে না উঠতো তবে কি তার প্রেমের তীব্রতা ততটাই টের পেতাম? এ আর রহমানের সঙ্গীত মানে কেবল চলচ্চিত্রের আরও একটি অনুষঙ্গ নয়; বরং চিত্রনাট্যে কাহিনীবিন্যাসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, পাত্র-পাত্রীর পরিস্থিতি মিটিয়ে গল্পের স্পন্দনকে চরিতার্থ করা।

মাত্র ১১ বছর বয়সে বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক ইল্ল্যারাজার সান্নিধ্য, কিংবদন্তি তবলা বাদক জাকির হোসেনের বিভিন্ন কনসার্টে যাওয়ার সুযোগ, ১৬ বছর বয়সেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদী সঙ্গীতে ডিগ্রি অর্জন– এ সবই প্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে তার আগমনী বার্তার জানান দিচ্ছিল। ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত জিঙ্গেল সাম্রাজ্য জয় করা শেষ। ওই বছরেই ক্যারিয়ারের সবচাইতে কাঙ্ক্ষিত বাঁকের দেখা পান যখন একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পরিচালক মণি রত্নমের সাথে তার পরিচয় হয়। প্রস্তাব মেলে তাঁর সাথে কাজ করার, ‘রোজা’ (১৯৯২) ছবিতে। আকাশছোঁয়া গল্পের সেই শুরু।

‘রোজা’ ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে রহমান তাঁর প্রথম ও শেষ সুযোগ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। নিজেকে প্রমাণের ব্যাপার তো ছিলই পাশাপাশি তাঁর ভাবনায় ছিল একদম নতুন ও ভিন্ন মাত্রার কিছু দেয়া। এমন সুরের বাঁধনে আবদ্ধ করলেন– যে সুরের ভাষায় অবিশ্বাস্য শুদ্ধতা; শান্ত সংযত যার প্রকাশভঙ্গি। রহমান নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ওইসময়ে তিনি একধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন সম্যক্ ব্যক্ত– রোজা’র গান ও নেপথ্যে। সেইসব সুরে কান পাতুন, হৃদয় নিংড়ানো অনুভূতিতে মন মন্ত্রমুগ্ধ হয়। প্রথম সৃষ্টি ‘চিন্না চিন্না আসাই’ (দিল হ্যায় ছোটা সা) । মিনমিনির গলায় চিরসবুজ গানটি আজও শ্রোতাপ্রিয়। উন্নি মেনন-সুজাতার কন্ঠে ‘পুধু ভেল্লাই মারাই’ তাঁর তৈরি শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক ট্র্যাকগুলোর একটি। গানটির চিত্রায়ণ, বিশেষ করে ওই নির্দিষ্ট ফ্রেম– যেখানে ‘রো

1
‘রোজা’র উষ্ণ আলিঙ্গনে ‘রিশি’

জা’ উষ্ণ আলিঙ্গনে ‘রিশি’কে বাঁধে– সে বাহুডোরে যেন সহস্র শব্দ বুনা। যত যাই হোক, সে রিশির পাশেই থাকবে; একদম শেষ পর্যন্ত। রোজা হয়তো সে কথা বলছে না, কিন্তু রহমানের সুরের সওয়ারী হয়ে আমরা তা ঠিকই শুনতে পারছি। বালাসুব্রামানিয়ামের কন্ঠে ‘কাধাল রোজাভে’ গানে রোজাকে কাছে পাওয়ার ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়। আবার ‘রুক্কুমানি’ গানটিতে মেলে উচ্চ-স্বরে রীতিবিরুদ্ধ উপস্থাপন। ‘থামিরা থামিরা’ দেশাত্ববোধক গানটির মাধ্যমে রহমান গজল-সম্রাট হরিহরণকে চলচ্চিত্র-সঙ্গীতে পরিচয় করিয়ে দেন। তামিল সঙ্গীতের চিরায়ত প্রথাই ভেঙ্গে দেয় অ্যালবামটি। ফলশ্রুতিতে শুধু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননাই পেয়েছেন তা নয়, টাইম ম্যাগাজিন এটিকে সর্বকালের সেরা ১০ সাউন্ডট্রাকে অন্তর্ভুক্ত করে।

এরপর তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম ‘থিরুদা থিরুদা’ (১৯৯৩)। এটি ছিল মণি রত্নমের সবচেয়ে হালকা মেজাজের ছবি; তাই ছবির সঙ্গীতে তিনি রহমানকে কোন নির্দেশনা না দিয়ে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। রহমান সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ভুল করেননি, বিশেষকরে ‘থী থী থিথিক্কুম’ গানে। গানটির প্রথম ৪০ সেকেন্ডে ‘জাথিস’-এর তালচক্রে বীট সংখ্যার সাথে বেস গিটারের সন্নিবেশে সঙ্গীত-জঁনরার অজ্ঞাত মিশ্রণ

2
‘থী থী থিথিক্কুম’ গানে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে

দেখালেন। অতঃপর সুরেলা কণ্ঠে ক্যারোলিন ‘বাহুদারি রাগ’ ধরেন এবং মুহূর্তেই আমাদের জাগতিক মন গূঢ় ধাঁধায় বাঁধা পড়ে। এর মাঝেই গানের মধ্যে ঢুকে পড়েন গায়ক নোয়েল জেমস আর তাতে গানের মেজাজ আরও গাঢ় হয়। অ্যালবামটিতে রহমান শব্দ নিয়ে নিরীক্ষার সাথে একদম অপরিচিত গায়কদের প্লেব্যাকে আনেন। ভারতীয় সঙ্গীত বিন্যাসে পশ্চিমা অর্কেস্ট্রার উপাদান ও টেকনো যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যাপক ব্যবহার করেন। অনুপমা’র কণ্ঠে ‘চন্দ্রলেখা’ গানটি টেকনো মিউজিকে করা– গায়িকা কণ্ঠে যেন শব্দের বাঁধ ভাঙ্গেন; ছন্দ ও যন্ত্রের মিশ্রণে তা ক্রমশ উচ্চস্বরে ধাবমান হয়। ‘রাসাথি’ গানে সহুল হামিদের কণ্ঠে ‘এ কপ্পেলা’র ব্যবহার দেখান– মানে যন্ত্র ছাড়া গায়ক খালি গলায় গাইবেন। গানটি এমনভাবে ধারণ হয়েছে শুনলে মনে হবে কোন দূরবর্তী কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে আর তার সাথে কিছুক্ষণ পরপর এসে যোগ হচ্ছে কোরাস কণ্ঠ। ‘পুথাম পুধু ভূমি’ গানে অপেরা, ‘ভীরাপান্দি কতায়িলে’ গানে বাঁশি ও তন্ত্রের আঁচড়, ‘কান্নুম কান্নুম’ গানে শব্দের ঝঙ্কার; মিলিয়ে অ্যালবামটির বিশদ বৈচিত্র্যে এটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে স্বীকৃত।

Ennavale Adi Ennavale - Kaadhalan - HD [Full HD,1920x1080][(003813)16-14-35]_20170703163728206
উন্নিকৃষ্ণানের কন্ঠে ‘এন্নাভালে আদি এন্নাভালে’

ওইসময়ে তাঁর সবচেয়ে বড় হিট ছিল ‘জেন্টলম্যান’ (১৯৯৩) ছবির ‘চিকু বুকু রাইলে’ গানটি। রহমান মাইকেল জ্যাকসনের একনিষ্ঠ ভক্ত; গানটি তাই পশ্চিমা পপ ধাঁচেই করা। এই গানের ব্যাপক জনপ্রিয়তার ফলে ছবির প্রযোজকরা তাঁর কাছে একই ধরণের গান চাওয়া শুরু করলেন। ‘কাধালান’ (১৯৯৪) ছবির ‘উর্বশী উর্বশী’ ও ‘মুকাবালা’– গান দুটি তারই ফসল। তাঁর গানের হিট তালিকায় এ দু’টি আগেরটিকেও ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য অ্যালবামটিতে প্রয়োজনমাফিক বৈচিত্র্য রয়েছে– ‘কাত্রু কুথিরায়িলে’ গানটি প্রেমের বিরহের কথা বলে, অন্যদিকে ‘এরানি কুরাধানি’ গান বলে লোকগীতির কথা। উন্নিকৃষ্ণানের কণ্ঠে ‘এন্নাভালে আদি এন্নাভালে’ তাঁর আরেকটি অসাধারণ রোমান্টিক ট্রাক। পরের গানটি ধরণের দিক থেকে একেবারেই আলাদা– ‘পেট্টাই র‍্যাপ’ পুরোপুরিই র‍্যাপ মিউজিক আদলে তৈরি।

‘বম্বে’ (১৯৯৫) ছবির সঙ্গীতে লোকগানের ছায়া ছেড়ে রহমান আরব ও রকধাঁচের সুরের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা অ্যালবামটিকে সেরা ১০০০ অ্যালবামে অন্তর্ভুক্ত করেছে– তাদের মতে যা আপনাকে মৃত্যুর আগে অবশ্যই শুনতে হবে! কেবল ’৯৫ সালেই বম্বে’র প্রায় পাঁচ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়। ‘উড়িয়ে

4
বেকাল ফোর্টে প্রেয়সীর তরে ‘উড়িয়ে উড়িয়ে’

উড়িয়ে’ (তু হি রে) গানটি রহমান কাকে দিয়ে গাওয়াবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। রহমান বলেন, “এ গানটির জন্য তিনটি কণ্ঠ পছন্দ ছিল– এস পি বালা স্যার, ইয়েসুদাস স্যার ও হরিহরণ। তিনজনের কণ্ঠেই গানটা ভাবলাম । তখন পর্যন্ত হরিহরণের গজল ছাড়া কিছু শুনিনি। জুয়া খেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। গানটি তৈরি হলো, হরিহরণ তাতে এক নতুন আস্বাদন এনে দিলেন।” সুরেশ পিটার্সের সাথে ‘হাম্মা হাম্মা’ গানে রহমান প্রথমবার গায়ক হিসেবে তাঁর মেধার নিদর্শন দেখালেন। চিত্রার কন্ঠে ‘কান্নালানে’ গানে তিনি কাওয়ালি বীটকে ব্যবহার করেছেন সৃজন উপায়ে; এই গানের হিন্দি ভার্সন ‘কেহনা হি ক্যায়া’কে গার্ডিয়ান ‘শুনতেই হবে’ এমন ১০০০ গানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ছবির আবহ সঙ্গীত– বিশেষকরে ‘শেখর’ যখন ‘সায়রা বানু’কে প্রথমবার দেখে– তখন নেপথ্যে বেজে উঠা রহমানের সুরে ‘প্রথম দেখাতেই ভালবাসা’ জাতীয় বায়বীয় কথাতে বিশ্বাস আরও তীব্র হয়। ‘বম্বে থিম’ এর তুমুল প্রশংসার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মন্ডলে এটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত; বেশ কয়েকটি হলিউড ছবিতেও এটি ব্যবহৃত হয়েছিল।

‘রঙ্গিলা’ (১৯৯৫) ছবি দিয়েই রহমানের হিন্দি ছবির জগত শুরু। আর প্রথম হিন্দি ছবিতেই আশা ভোঁসলেকে দিয়ে ‘রঙ্গিলা রে’ গানটি গাইয়ে সেই অ্যালবামকে আলোচনার তুঙ্গে নিয়ে আসেন। হরিহরণ ও স্বর্ণলতার কণ্ঠে ‘হ্যায় রামা’ গানে আনলেন ধ্রুপদী সঙ্গীতের সুরধারা। গানটিতে সুর-তাল-লয় এমন এক সমাবেশ তৈরি করলো, যেখানে দোদুল্যমান তালের মধ্যে দিয়ে গান সরলরেখায় এগিয়ে চলেছে। এক সাক্ষাৎকারে গীতিকার জাভেদ আখতার বলেন, “শচীন দেব বর্মণের গান শুনলে দেখা যায় কোন এক গানে তিনি বড়জোর একটা বা দুইটা যন্ত্রের ব্যবহার দেখিয়েছেন, আর নিজের সুরের কারুকাজ ও শব্দের উপর থেকেছে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। একই ব্যাপার রহমানের সঙ্গীতেও পাওয়া যায়। একদিকে সে আপনাকে যেকোন ধরণের অর্কেস্ট্রা, যেকোন ধরণের স্তর দিতে প্রস্তুত, অন্যদিকে ‘ধীমি ধীমি’র মতো গানে সে জানে কেবল একটি একতারা, একটি বিট, একটি যন্ত্র বা একটি বাঁশির সুরই যথেষ্ট।” ‘১৯৪৭ঃ আর্থ’ (১৯৯৮) ছবির এ গানটিতে খেয়াল করলে দেখবেন ৫ মিনিট ১৫ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের গানটির সুরের কারুকাজ কেবল একটি যন্ত্রের ভিত্তিতে করা।

রহমানের পরবর্তী অ্যালবামগুলো বৈচিত্র্যের দিক থেকে যেন আরও সমৃদ্ধ। ‘ইরুভার’ (১৯৯৭) ও ‘দিল সে’ (১৯৯৮) তেমনই দুইটি অ্যালবাম। ‘ইরুভার’ ১৯৬০-এর প্রেক্ষাপটে হওয়ায় প্রত্যেকটি গানের সুর ও যন্ত্রে ওই সময়ের আবহ আনতে হয়েছে। জ্যাজ জঁনরায় পিয়ানোর প্রকট ব্যবহারে ‘হ্যালো মিস্টার ইদিরকাতছি’ গানে কম্পিত পুরুষ কণ্ঠের সাথে সবচেয়ে আকর্ষণ দিক– নারীকণ্ঠের ভগ্নস্বরে সংলাপ কথন। ‘কান্নাই কট্টিকলাদে’ গানে মূল গায়কের গাওয়া প্রত্যেক লাইনের ‘শেষ শব্দ’ কোরাস কণ্ঠ পুনরাবৃত্তি করে– যেটি ৬০-দশকের গানের একটি স্টাইল। আশা ভোঁসলের কণ্ঠে ‘ভেন্নিলা ভেন্নিলা’ জ্যাজের সাথে পিয়ানো আর সাক্সোফোনের তাল মিলে অন্য মাত্রা আনে। ‘পুকরিয়িন পুন্নাগাই’ গানটিতে ৬০-এর আবহ তৈরিতে, গানে ব্যবহৃত নারী কণ্ঠটিই যথেষ্ট ছিল। ‘নারুমুগায়ে’ গানটির সুরে ছিল কর্ণাটকী ফর্ম, যন্ত্রে তবলা-বাঁশি-মেন্ডালিন-ভায়োলিন আর কণ্ঠে ছিলেন দুই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী উন্নিকৃষ্ণান ও বম্বে জয়শ্রী। ‘উদাল মান্নুকু’ ও ‘উন্নুড়ু নান ইরুন্ধা’; অভিনেতা অরবিন্দ স্বামীর আবৃতিতে দুটি কবিতা। মণি রত্নমের সাথে প্রায় প্রত্যেকটি কাজে রহমানের সেরাটা

t76V2MEdBX6mGHqlw3qy4jVSl3C
প্রেয়সীর আত্মায় শরীর-মগ্নের অনুনয়ে ‘সাতরাঙি’

পাওয়া গেছে- ‘দিল সে’ সম্ভবত তার মধ্যে শ্রেষ্ঠটি। প্রাচীন আরব্য সাহিত্যে সংজ্ঞায়িত ভালোবাসার সাতটি ধাপ নিয়ে ছবিটি নির্মিত। লক্ষণীয়, এই সাতটি ধাপের সবক’টিকে তিনি ‘সাতরাঙি’ গানে একত্র করেছেন। গুলজারের লিরিকে সেই ধাপগুলোকে অতি কৌশলে বোনা হয়েছে। গানটি শুরু হয় কবিতা কৃষ্ণমূর্তির তীক্ষ্ণ সুরের আর্তনাদ দিয়ে। এরপর সনু নিগম প্রেয়সীকে সাত রঙের সাথে তুলনা করে গান শুরু করেন, শেষ করেন প্রেয়সীর আত্মায় শরীর-মগ্ন হওয়ার অনুনয় নিয়ে। উদিত নারায়ণের দরাজ কণ্ঠে ‘অ্যায় আজনাবি’ গানটি যেন প্রেয়সীর খোঁজে প্রতিটি ভেঙে যাওয়া মনের ব্যঞ্জনা বুঝাতে সক্ষম। কম্পিত হৃদয়ের তীব্রতাকে প্রকাশ করে রহমানের গাওয়া ‘দিল সে রে’। সুখবিন্দর সিংয়ের প্রবল কণ্ঠে ‘ছাইয়া ছাইয়া’– জনপ্রিয়তার এতই তুঙ্গে ছিল যে বিবিসির এক জরিপে সর্বকালের সেরা ১০ গানে তালিকাভুক্ত হয়; আর রাতারাতিই শুরু হয়ে যায় সুখবিন্দরের তারকা খ্যাতি। কর্ণাটকী সুরে কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকর কণ্ঠ দিলেন ‘জিয়া জ্বালে’ গানটিতে। অন্যদিকে ছবির আবহ সঙ্গীতে রহমান পাশ্চাত্য সঙ্গীত শোনার অনুভবকে কাজে লাগিয়েছেন সম্পূর্ণরূপে।

হরিহরণের গাওয়া শ্রুতিমধুর গান ‘পাচ্চাই নিরামে’ সঙ্গীত-পিপাসু মাত্রই অধিক পরিচিত। গীতিকার ভাইরামুথু পুরো গানটি বিভিন্ন রঙের বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন। গানটির হিন্দি ভার্সন ‘সাথিয়া’ সনু নিগমের কণ্ঠে ঠিক ততটাই সর্বজন প্রিয়। ‘আলাইপায়ুথে’ (২০০০) ছবির প্রায় প্রত্যেকটি গানকেই শ্রোতারা তখন সাদরে গ্রহণ করেছিল। সাধনা সারগামের মধুসর্বস্ব কণ্ঠে ‘স্নেহিথানে’ যেন স্বামীর প্রতি স্ত্রীর একটি গীতিকাব্য। ‘কাধাল সাদুগুদু’ গানটি ইন্ডিপপ জঁনরায়, আশা ভোঁসলে ও শঙ্করের কণ্ঠে ‘সেপ্টেম্বর মাধাম’ ডুয়েটটি দ্রুত লয়ের, ‘ইয়ারো ইয়ারদি’ লোকজ যন্ত্রের উপর তৈরি এবং ‘এন্দ্রেনদ্রুম পুন্নাগাই’ রহমানের আরেকটি হিট

6
‘চালে চালো’ গানে একত্ব হবার আহবান

নাম্বার। এরপর এলো ‘লগান’ (২০০১)। ছবির গান ও আবহ সঙ্গীত মিলিয়ে রহমানের আরও একটি সেরা কাজ। জাভেদ আখতারের লেখা ‘মিতওয়া’ খুব প্রশংসিত হয়েছিল উদিত নারায়ণের গলায়। বৃষ্টির প্রার্থনায় সম্মিলিত কণ্ঠের গান ‘ঘানান ঘানান’ নৃত্য ছন্দের আমেজ তুলে আনে। ‘চালে চালো’ গানের কথায়, লগানের (খাজনা) চাপে শোষিত মানুষদের একত্ব হবার আহবান; রহমানের সুর সেই আহবানকে আরও স্পষ্ট করে। আবার একদিকে লতা-কে দিয়ে ইশ্বরের কাছে দয়াপ্রার্থনায় গাইয়েছেন ‘ও পালানহারে’, অন্যদিকে আশা ভোঁসলে-কে দিয়ে রাধামূর্তির অর্পণে ‘রাধা ক্যায়সে না জ্বালে’। আর ‘ও রে ছোরি’ গানটির সুর প্রেম অনুভূতিতে ঠাসা।

আয়ো রে সখি’ গানের মাধ্যমে রহমান অস্কারের প্রাথমিক স্তরে প্রথমবার প্রবেশ করেন । তাঁর আরও দুইটি গান ‘খালবালি’ ও ‘লুক্কা চুপি’ অস্কারের প্রাথমিক স্তরে যায় কিন্তু এর কোনটিই মূল স্তরে প্রবেশ করতে পারেনি। হিন্দুস্তানি বাদ্যযন্ত্র ও সুরধারায় ‘আয়ো রে সখি’ বৃষ্টির অনুরণনে প্রেমগ্ন হৃদয়ের যুগলবন্দি করে। সাধনা সারগামের কণ্ঠে ‘পিয়া হো’ গানটিতে অনুভুত হয় হতভাগ্য বিধবা’র আর্তি; আর্তি একটুখানি

7
‘পিয়া হো’ গানে অনুভূত হয় হতভাগ্য বিধবা’র আর্তি

ভালোবাসার, আলোয় ফেরার। গানে ২য় আলাপের পর বাঁশিতে যে সুর বেজে উঠে, সেই সুরেও থাকে একই মেজাজ। একই কণ্ঠে ‘ন্যায়না নীর বাহায়ে’ বর্ণনা করে বিধবা’র প্রণয়পীড়িত যাতনাকে; রহমান এখানে সেতার ও বাঁশির কিঞ্চিৎ আঁচড় রেখেছেন। হোলি উৎসবকে কেন্দ্র করে রয়েছে ‘শাম রাঙ ভার দো’ গানটি। ‘ভাঙ্গারি মররি’ গানটি জাপানি বৌদ্ধ দর্শন মতে পাঁচ উপাদানের একটি– ‘পানি’ দ্বারা প্রচন্ডভাবে অনুপ্রাণিত। মণি রত্নম ছাড়া দীপা মেহতার ছবিতে সঙ্গীত দেয়ার ব্যাপারে রহমান বরাবরই উদার। ‘ওয়াটার’-ই (২০০৫) একমাত্র অ্যালবাম যেটিকে রহমান নিজে ১০/১০ রেটিং করেছেন। অন্যান্য অ্যালবামের মতো ‘গুরু’ (২০০৭) ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। ‘তেরে বিনা’ একটি প্রেমগাঁথা, বিচ্ছেদের গান হওয়া সত্ত্বেও এটি চিত্রায়িত হয়েছে দম্পতির সুখ মুহূর্তগুলো দিয়ে। অর্থাৎ রহমানকে একই সুরে আবেগ ও বিষণ্ণতা ধারণ করতে হয়েছে। আর গুলজারের কথায় প্রিয়জনকে ছাড়া প্রতিটি মুহূর্ত রূপকার্থে ‘বিস্বাদ রাত’এর মতো। ‘বারসো রে’ বৃষ্টির গান। গুলজারের অপূর্ব শব্দবিন্যাসে হরিহরণের মখমলে গলায় ‘অ্যায় হ্যায়রাথে’ রহমানের হৃদয়গ্রাহী গানগুলোর একটি। ‘জাগে হ্যায়’ গানটি যেন স্বপ্নের কাছে আকুতি; এমন সুর শ্রুতিকে প্রশান্তি দেয়। মিশরীয় প্রভাবিত সুরে ‘মাইয়া মাইয়া’ হিট নাম্বারটিতে কণ্ঠ মেলান মিশরেরই গায়িকা মারয়েম তলার। আর ‘শখ হ্যায়’ গানটির আবহ জুড়ে অপূর্ণ শখের বিষণ্ণতা। লক্ষণীয়, গুরু’র প্রত্যেকটি গানের সুরে শব্দকে সংকুচিত করে হলেও অর্কেস্ট্রার মধ্যে– দাম তারা দাম তারা, নান না রে, মাইয়া মাইয়া বা ইয়ামো ইয়ামো– কোরাস বীট সম্ভবত এজন্যেই ঠেসে দেয়া; যাতে শ্রোতারা মেলোডিতে সুর মেলাতে না পারলেও যেন এসব কোরাসে গুনগুন করতে পারেন। এ সময়ের আরেকটি গানের প্রসঙ্গ টানতে হয়, ‘যোধা আকবর’ (২০০৮) ছবির ‘খাজা মেরে খাজা’। সুফি ধাঁচে নিজের কণ্ঠে গাওয়া গানটি রহমানের ব্যক্তিগত পছন্দের।

কী অদ্ভুত, যে গানটি দিয়ে রহমান তাঁর কাঙ্ক্ষিত অস্কারের দেখা পেলেন, সেটি তিনি ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ (২০০৯) ছবির জন্য তৈরি করেননি! ‘জয় হো’র সুর তিনি করে রেখেছিলেন বছরখানিক আগে ‘যুবরাজ’ ছবির জন্য। ছবির পরিচালক সেই সুরকে তার ছবির জন্য নির্বাচন করেননি; রহমান সেই সুর ব্যবহার করলেন ‘জয় হো’ গানে। তারই ফলশ্রুতিতে, প্রথম অস্কার জয়! অস্কারে তাঁর দুটি গান মনোনয়ন পেয়েছিল; একটি ‘জয় হো’, অন্যটি ‘ও ছায়া’। ‘ও ছায়া’ নেপথ্যে ছন্দময়তা রেখে ঢোলের তালে চড়া স্বরে স্ফুরিত হয়। ‘রিয়টস’ ইন্সট্রুমেন্টালে সম্ভবত আফ্রিকান উপজাতীয় ধ্বনিতে বৈদ্যুতিক শব্দ ও সিন্থ-আবহ এনেছেন। একটা শান্ত

8
‘জয় হো’ গানে কাঙ্খিত অস্কার জয়

মোহিত আবহ চলতে শুরু করে ‘মৌসুম ও এস্কেপ’ ইন্সট্রুমেন্টালে; যতক্ষণ না অর্কেস্ট্রার তন্ত্রীর সাথে সেঁতারের লোমহর্ষক মিশ্রণ ঘটে। ‘রিঙ্গা রিঙ্গা’ ৯০-এর ভারতীয় সঙ্গীতকে রহমানের ট্রিবিউট। পশ্চিমা হিপ-হপের সাথে ভারতীয় শাস্ত্রীয় কণ্ঠের মিশ্রণ পাওয়া যায় ‘লিকুইড ড্যান্স’ ট্রাকে। ‘লতিকা থিম’ ও ‘ড্রিমস অন ফায়ার’– গান দুটি একই সুরে তৈরি; পার্থক্য কেবল প্রথমটিতে সুরেই থেকেছে নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বিতীয়টিতে যন্ত্র এসে যোগ হয়েছে। লতিকা থিমের মিষ্টি সুললিত সুর মনকে আচ্ছন্ন করে। তাতে আবারও রহমানের সুরের উপর নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা লক্ষ্য করা গেছে। ‘মিলিয়নিয়ার’ বেস ও সিন্থের সাথে দ্রুত লয়ের ট্রাক। টেকনো হিপ-হপ ছন্দের সাথে কিছুটা জ্যাজ, কিছুটা জ্যামাইকান রিগ্গী বীট ও র‍্যাপ মিলে ‘গ্যাংস্টা ব্লুজ’ একটা গ্যাংস্টা র‍্যাপ ট্রাক। এই একটি অ্যালবামেই যেন রহমান বিশ্বসঙ্গীতের যুগপৎ ঘটিয়েছেন, বোধ করি সেজন্যেই বিশ্বসঙ্গীত রহমানকে গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা, গ্র্যামি ও অস্কারে সম্মানিত করেছে।

রহমানের গুণগানে হাজারটা উদ্ধৃতি দেয়া যায় কিন্তু যে যুগলবন্দীতে ভারতীয় সঙ্গীতের সমৃদ্ধি (অস্কার জয় সহ) অনেকাংশে দায়ী, তাঁর উদ্ধৃতি আনাটা যথোচিত হবে। গুলজারের মতে, “রহমান স্বতন্ত্রভাবেই চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের ধ্বনিকে বদলে দিয়েছে। সে গানের স্থায়ী-অন্তরা-স্থায়ী গঠনকে ভেঙ্গেছে এবং প্রথাগত সুরকরণ নমুনায় এনেছে পরিবর্তন। সে কাছাকাছি সুরের দুটি ভিন্ন গানেও অভিন্ন ছন্দ দিতে পারে। কিন্তু উভয় গানই যদি কোন শ্রোতা পরপর শুনেন তবুও তা আপনাকে ধরে রাখবে। নির্দিষ্ট বিন্যাস সত্ত্বেও, তাঁর গান নিজস্ব সঙ্গীত ধারায় মুক্ত কবিতার মতো দৌড়ে চলে।”

তথ্যসূত্রঃ

১. Rahman on his music, his life – NDTV Interview
২. Roja was my benchmark, says A R Rahman – Interview with Rajeev Masand
৩. Jive-talkin’ with Rahman – Filmfare Interview
৪. A. R. Rahman’s Psychedelic Masterpiece: A Song That Took Indian Cinema By Storm! – Mani Prabhu
৫. শব্দই বলে দেবে, আপনি কোথায় – সাক্ষাৎকারঃ এ আর রহমান – সাজ্জাদ শরিফ
৬. Guru Music Review – Baradwaj Rangan


এই লেখাটি মূলত প্রকাশিত হয়েছিল ‘মুখ ও মুখোশ’ অনলাইন সিনে ম্যাগাজিনের জন্য। সেই লেখা পড়তে যেতে হবে এই লিংকেপরবর্তীতে ‘নিয়ন আলোয়’ অনলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। পড়তে যেতে হবে এই লিংকে 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s