পদ্মা নদীর মাঝি – জেলেপাড়ার রূঢ় বাস্তবতা

padma-nadir-majhi-dvd-538-800x800

কুবের ও কপিলা নদীর ঘাটের দিকে চলিতে লাগিল সকলের পিছনে।
[কপিলাঃ] চুপিচুপি ‘না গেলা মাঝি, জেল খাট।’
[কুবেরঃ] ‘হোসেন মিয়ার দ্বীপে আমারে নিবই কপিলা। একবার জেল খাইটা পার পামু না। ফিরা আবার জেল খাটাইব।’
কপিলা আর কথা বলে না।

১৯৩৪-৩৫ সালে লিখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটির আবেদন সর্বকালীন। তিনি তার উপন্যাসের প্লট হিসেবে পদ্মা পাড়ের জীবনকে তুলে এনেছেন এবং চরিত্রগুলোতে দেখিয়েছেন বাস্তবতা। সে সমাজে রয়েছে শোষণ, বঞ্চনা, অবহেলা, জটিলতা আবার রয়েছে ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ যা বর্তমান সমাজেরও প্রতিফলন। পদ্মার নদীতে শুধু জলের স্রোত। জলে-স্থলে মানুষের অবিরাম জীবনপ্রবাহ। জেলেপাড়ার বর্ণনায় দরিদ্র জেলেপাড়ার মানুষের সকল বঞ্চনা যেন উঠে এসেছে,

“স্থানের অভাব এ জগতে নাই তবে জেলেপাড়ার গায়ে গায়ে ঘেঁষা বাড়িগুলো যেন বলে দেয় মাথা গুঁজিবার ঠাই ওদের ওইটুকুই।”

কুবের জেলে পাড়ার রূঢ় বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসা এক চরিত্র। বিপুলা পদ্মা তার আহার যোগায়। সে তার সন্তানদের ভালোবাসে, স্ত্রী মালা পঙ্গু হলেও সে কখনো তার অনাদর করেনি। এদিকে কুবেরের জীবনে কপিলা আসে স্রোতের মতো। কপিলা, মালা’র ছোট বোন। অবাধ্য, বুদ্ধিমতী ও রহস্যময়ী চরিত্র। নির্জন নদীতীরে সন্ধ্যারাতে কপিলা যখন কুবেরের হাত টানাটানি করে বলে উঠে ‘আমারে নিবা মাঝি লগে’, নিরীহ শান্ত কুবের অবাধ্য কপিলার এ আবদার বুঝে উঠতে পারে না উল্টো বলে ‘বজ্জাতি করস যদি, নদীতে চুবান দিমু কপিলা!’ এ কথা শুনে কপিলা হাসতে হাসতে কাদায় বসে পড়ে বলে ‘আরে পুরুষ!’ অবচেতন মনে কপিলার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে কুবের! মালার শারীরিক পঙ্গুতাও হয়তো এর পেছনে কারণ।

padma

কিন্তু কপিলাকে কখনোই কুবের ঠিক বুঝে উঠতে পারে না! কপিলার সতীন মারা গেলে তার স্বামী যখন কপিলাকে নিতে আসে সে তখন ঠিকই কুবেরকে ফেলে স্বামীর ঘরে চলে যায় আবার কুবেরের বিপদে তার কাছেই ফিরে আসে। এ যেন নারীর চিরন্তন রহস্যময়ী রূপ। কুবের কপিলার কাছে খুব বেশী কিছু চায় না। সে চায় গোপনে দু’টা সুখ-দুঃখের কথা বলতে, চায় কপিলা তার সাথে একটু রহস্য করবে, বাঁশের কঞ্চির মতো অবাধ্য ভঙ্গিতে টিটকারি দিবে, ধরে নোয়াতে চাইলে কাদায় বসে পড়বে, চাপা হাসিতে নির্জন নদীতীরে রোমাঞ্চ তুলবে। অন্যদিকে মালার জগত ঘরের চার দেয়ালে তার সন্তানদের নিয়ে। কুবেরের কথায়, ‘সে কখনো উঠে নাই, হাঁটে নাই, ঘুরিয়া বেড়াইয়া চারিদিকে জীবনকে ছড়াইয়া মেলিয়া রাখিতে পারে নাই’, সেজন্য অবশ্য কুবেরের কোনদিন আফসোস ছিল না।

‘কুবের’ ও ‘কপিলা’ চরিত্রে যথাক্রমে ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ ও রূপা গাঙ্গুলি। আর ‘মালা’ চরিত্রে ছিলেন চম্পা। প্রত্যেকেরই অভিনয় চরিত্রসই যথাযথ। জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্রে আসাদ বরাবরই অসাধারণ। কুবের চরিত্রে তার তুলনা তিনি নিজেই। ‘কপিলা’ যে কোন অভিনেত্রীর জন্য স্বপ্নের মতো একটা চরিত্র। ছবির আরেক চরিত্র ‘হোসেন মিয়া’। হোসেন মিয়া চরিত্রে ছিলেন উৎপল দত্ত। তার চরিত্র গল্পে ভিন্ন একটা মোড় আনে। সে স্বপ্ন দেখে ময়নাদ্বীপের– যেখানে ভেদাভেদ নেই, শোষণ নেই, নেই কোন ধর্ম। সে স্বপ্ন পূরণ করতে কেতুপুর জেলে পাড়ার মানুষকে উন্নতর জীবনের স্বপ্ন দেখায় সে, সুযোগ নেয় তাদের অসহায়ত্বের, দুর্বলতার।

কুবের নীরবে হোসেনের নৌকায় উঠিয়া গেল। সঙ্গে গেল কপিলা। ছইয়ের মধ্যে গিয়া সে বসিল।
[কপিলাঃ] কুবেরকে ডেকে ‘আমারে নিবা মাঝি লগে?’
হ, কপিলা চলুক সঙ্গে। একা অতদূরে কুবের পাড়ি দিতে পারিবে না।

পদ্মা নদীর মাঝি (Padma Nadir Majhi) (1993)
● Running time: 126 min ● Release date: 16 May 1993 ● Color: Color ● Country: Bangladesh/India ● Language: Bangla ● Genre: Drama/Romance Producer: Habibur Rahman Khan, West Bengal Film Development Corporation ● Cinematographer: Goutom Ghosh ● Editor: Moloy Banerjee ● Art: Mohiuddin Faruque ● Music: Goutom Ghosh, Alauddin Ali ● Novel: Manik Bandopadhay ● Cast: Raisul Islam Asad, Champa, Rupa Gangooly, Utpal Dutt, Humayun Faridi, Rabi Ghosh, Mamata Shankar, Ajijul Hakim Writer & Director: Goutom Ghosh 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s