বাসু চ্যাটার্জী’র ‘ব্যোমকেশ বক্সী’

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যোমকেশের ৩২টি গল্পই লিখেছিলেন ১৯৩২-১৯৭০ এর মধ্যবর্তী সময়ে। গোয়েন্দা গল্পের শুরুটা অবশ্য তারও আগে ১৮৯০ এর দিকে যখন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা প্রিয়নাথ মুখার্জী একটি পত্রিকায় ‘দারোগার দপ্তর’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশ করা শুরু করলেন। দারোগার দপ্তরে ছিল না কোন পুঁথিগত স্বাদ, কেবল ব্যক্তি অভিজ্ঞতার একটি বিবরণ মাত্র অথচ এটিই কি না জনপ্রিয় সিরিয়াল হয়ে এক দশক ধরে চললো! যাই হোক তার এই জনপ্রিয়তা পরবর্তীতে অনেককেই সাহিত্যের এই ধারায় লিখতে উৎসাহিত করলো। সময়ের পরিক্রমায় বাঙালি গোয়েন্দারা হয়ে উঠলেন আরও বুদ্ধিমান, তীক্ষ্ন দৃষ্টিসম্পন্ন এবং অসাধারণ বিশ্লেষণধর্মী। সেই পরিক্রমণেই শরদিন্দু রচিত ব্যোমকেশ বক্সী’র আত্মপ্রকাশ। যদিও ব্যোমকেশ নিজেকে ‘গোয়েন্দা’ পরিচয় দিতে মোটেই পছন্দ করেন না, বরং তিনি নিজেকে ‘সত্যান্বেষী’ বলেন যে কেবল সত্যের খোঁজ করে চলেছে।

সত্যান্বেষী ব্যোমকেশের আবির্ভাব ‘সত্যান্বেষী’ গল্পের মাধ্যমে। এই সত্যান্বেষী গল্পে কেসের সমাধান করতে গিয়ে তার পরিচয় হয় অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে। পরিচয়ের পর বন্ধুত্ব। শার্লক হোমসে ডাঃ জন ওয়াটসন যেমন শার্লকের অভিজ্ঞতা লিপিভুক্ত করে রাখতেন, ব্যোমকেশে অজিতের কাজ একই। ব্যোমকেশ একই সাথে শিক্ষিত, মার্জিত, তীক্ষ্নদৃষ্টি ও বুদ্ধিমান। তবে তিনি ঠিক ফেলুদার মতো কুমারত্ব বজায় রাখা কেউ নন বা ব্লেকের মতো লার্জার দ্যান লাইফ কোন চরিত্র কিংবা শার্লকের মতো কোন পাগলাটে প্রতিভা! ঘরে তার স্ত্রী (সত্যাবতী) রয়েছে, আর দশটা আটপৌরে বাঙালির মতন যিনি সংসারটা দেখেন আবার গোয়েন্দাগিরিও করেন। শরদিন্দু যে কেবল ব্যোমকেশের প্রেম-বিয়ে দেখিয়েছেন তা নয়, সংসারের দাম্পত্য কলহ পর্যন্ত দেখিয়েছেন! অন্যদিকে ব্যোমকেশ তার বেশিরভাগ কেসের সমাধান খুঁজে নিতেন সামাজিক সমস্যা থেকেই। কমপক্ষে এমন তিনটি গল্প পাওয়া যাবে যেখানে ব্যোমকেশ আসামীকে বিনা দণ্ডে মুক্তি দিয়েছেন কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন তারা অবস্থার শিকার ছিল! প্রসঙ্গক্রমে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,

“গোয়েন্দা কাহিনীকে আমি ইন্টেলেকচ্যুয়াল লেভেলে রেখে দিতে চাই। ওগুলি কেবল গোয়েন্দা কাহিনী নয়। মানুষের সহজ সাধারণ জীবনে কতগুলি সমস্যা অতর্কিতে দেখা দেয় – ব্যোমকেশ তারই সমাধান করে। আমি জীবনকে এড়িয়ে কোনদিন গোয়েন্দা গল্প লেখার চেষ্টা করিনি।”

‘ব্যোমকেশ’ চরিত্রে উত্তম কুমার অভিনয় করেছিলেন, অভিনয় করেছেন হালের আবীর চ্যাটার্জীও। সত্যান্বেষী এই চরিত্রের ‘চিড়িয়াখানা’ গল্প নিয়ে সত্যজিৎ রায় কাজ করেছেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ করেছেন ‘চোরাবালি’ গল্প নিয়ে কাজ। অঞ্জন দত্ত তো রীতিমত আবীরকে নিয়ে ব্যোমকেশের ট্রিলজি নির্মাণ করে ফেলেছেন! দিবাকার ব্যানার্জী আবার একে বড় বাজেটে বড় ব্যানারে করে নিয়ে গেছেন বলিউডে! এতো গেলো চলচ্চিত্র পর্দার কথা। ব্যোমকেশকে কিন্তু বেশ কয়েকবার টিভি-পর্দায়ও হাজিরা দিতে হয়েছে। শুরুটা ১৯৮০ শুরুর দিকে। অজয় গাঙ্গুলিকে ব্যোমকেশ করে কলকাতা দূরদর্শনের প্রযোজনায় বেশ কয়েক পর্ব প্রচারিত হয়েছিল। এরপর একে টিভি পর্দায় নিয়ে আসেন বাসু চ্যাটার্জী । এবার রাজিত কাপুর ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। বাসু চ্যাটার্জী-রাজিত কাপুর জুটির ব্যোমকেশই এখন পর্যন্ত বহুল প্রশংসিত টিভি সিরিজ হিসেবে স্বীকৃত। হিন্দি ভাষায় নির্মিত এই টিভি সিরিজ দুই মেয়াদে (১৯৯৩ এবং ১৯৯৭) ডিডি ন্যাশনালে দেখানো হয়। যথাক্রমে ১ম ও ২য় মেয়াদে ১৪ ও ২০ পর্ব প্রচারিত হয়।

2
ব্যোমকেশ ও অজিত রহস্য সমাধানে ব্যস্ত

টিভি সিরিজটির অনাড়ম্বর উপস্থাপনই এর চৌম্বক অবয়ব। বাসু চ্যাটার্জীর নির্মাণ ধরণও তাই। ‘ছোটি সি বাত’ (১৯৭৬) বা ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ (১৯৯৮) এর প্রসঙ্গ টানলেও সে খোঁজ পাওয়া যাবে। যুতসই লোকেশন নেই, দামী সেট নেই, ক্যামেরার তড়িৎ কোন গতি নেই কেবল অভিনয় সংযোজন দিয়ে কোন টিভি সিরিজের এমন গ্রহণযোগ্যতা বস্তুত প্রশংসা যোগ্য। রাজিত কাপুর তার চরিত্রের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন, তাঁকে মে মাসের প্রচন্ড গরমে কাজ করতে হয়েছিল। উচ্চারণ ভঙ্গিতে রাখতে হয়েছে বিশেষ খেয়াল কারণ নির্দেশনা ছিল কথা বলতে হবে শুদ্ধ সংস্কৃত হিন্দিতে, প্রচলিত হিন্দিতে নয়। চরিত্রকে মাথায় রেখে নির্দিষ্ট ভাষার নমুনা ও ছন্দকেও বজায় রাখতে হয়েছিল। আর নিয়মিত চরিত্রের অভিনেতাদের ওয়ার্কশপ তো চলতো বছর ধরে! সে জন্যই বোধহয় এখনো রাজিত কাপুরকে লোকে ব্যোমকেশ বক্সী নামেই চেনে।

ব্যোমকেশ বক্সী (টিভি সিরিজ)
সময়কালঃ ১৯৯৩ এবং ১৯৯৭
মোট পর্বঃ ৩৪ (১ম – ১৪ পর্ব এবং ২য় – ২০ পর্ব)
চরিত্রে অভিনয়ঃ রাজিত কাপুর (ব্যোমকেশ বক্সী), কে কে রাইনা (অজিত), সুকন্যা কুলকার্নি (সত্যাবতী)

459576_20160428051324541
ব্যোমকেশ বক্সী (১৯৯৩)

Episodes & Links

Season 1 (1993)

Season 2 (1997)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s