কাঞ্চনজঙ্ঘা – প্রতিক্ষিপ্ত ভাবনায়

01

এ পরবাসে রবে কে হায়!
কে রবে এ সংশয়ে সন্তাপে শোকে ॥

হিমালয়ের চূড়ায় বসে ‘লাবণ্য’ খুঁজে পায় জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব চাপা পড়ে আছে দুঃখ-ভয়-সংকটে! যেন জগতে আপন কেউ নাই! সে আর মুখ বুজে সব সহ্য করে যাবে না । প্রয়োজনে দাম্ভিক-রক্ষণশীল স্বামীর বিরুদ্ধে লড়বে। রক্ষণশীল চিন্তার বেড়াজালে পিষ্ট নিজের জীবনের পুনরাবৃত্তি হতে দিবে না। নিজের মেয়ের ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য সে লড়বে। মানব সম্পর্কের এমনতর জটিলতা নিয়েই সত্যজিৎ রায়ের প্রথম মৌলিক চিত্রনাট্যের পর্দারূপ “কাঞ্চনজঙ্ঘা’।

হিমালয়কে পশ্চাৎপটে রেখে সত্যজিৎ সম্পর্কের জটিলতার উত্তর খুঁজেছেন। মানব মনের ব্যাখ্যায় আশ্রয় নিয়েছেন চিত্রে, রূপকে বা কখনো প্রতীকী অর্থে। আবহ তৈরিতে চরিত্র বলয়ে দিয়েছেন বিচ্ছিন্নতা, রিক্ত শব্দহীনতা আর অপ্রস্তুত পরিস্থিতি। তার সাথে করে প্রকৃতি এগোয় নিজস্ব পথে– অত্যুজ্বল রৌদ্র থেকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ তারপর ক্রমবর্ধমান কুয়াশা, কুয়াশায় অস্পষ্ট হয় চারদিক। যেন দার্জিলিংয়ের বিষণ্ণ আবহে বন্দী চরিত্রদের অতৃপ্ত অনুভূতি।

দার্জিলিংয়ে বেড়াতে আসা ইন্দ্রনাথ-পরিবারের ছুটির আজ শেষ দিন। ঔপনিবেশিক অভিজাততন্ত্রে বিশ্বাসী ইন্দ্রনাথ রায় তার ছোট মেয়ে মনিশার বিয়ে দিতে চান নিজ পছন্দে, একই শ্রেণীর ধনবান পাত্রের হাতে। আমরা দেখতে পাই, ইন্দ্রনাথের পছন্দে বিয়ে হওয়া তার বড় মেয়ের সংসারের জটিলতা বা তার বখে যাওয়া পুত্রের কান্ডকারখানা। এদিকে পরিবারের সবাই অপেক্ষা করে আছে উপর্যুক্ত পাত্র মিস্টার ব্যানার্জির সাথে মনিশার আলাপচারিতা কতটা ফলপ্রসূ হয়। এরই মধ্যে মনিশার পরিচয় হয় কলকাতা থেকে চাকরি সন্ধানে আসা অশোকের সাথে।

2_20160925011358620

ইন্দ্রনাথ রায়ের স্বভাব সমন্ধে আমরা ধারণা পাই যখন দেখি তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে দেখেন ‘সাহেব ঠ্যাঙ্গানোর হিড়িক’ হিসেবে; আবার একটি সুকণ্ঠী পাখির ছবি দেখে বলেন, যে পাখি রোস্ট করে খাওয়া যাবে না অমন পাখিতে তার আগ্রহ নেই! ঘটনাক্রমে বেকার তরুণ অশোকের সাথে পরিচয় ইন্দ্রনাথ রায়ের। একটি চাকরির ভীষণ প্রয়োজন তার। অথচ ইন্দ্রনাথের দেয়া ভালো মাইনের চাকরির প্রস্তাব সে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। কারণ পদে পদে বাঙালি জাতকে অপদস্থ করে যাওয়া ব্রিটিশ-অনুরক্ত ইন্দ্রনাথ রায়ের নেতিবাচক মনোভাব বুঝতে দেরী হয় না তার। এ প্রত্যাখ্যানে হতবাক হন ইন্দ্রনাথ রায়, আর নিজের দৃঢ় মানসিকতা দেখিয়ে ইন্দ্রনাথের দাম্ভিকতাকে চূর্ণ করে উল্লসিত হয় অশোক। প্রায় পুরো ছবিটাই পারিবারিক নাটকীয়তায় আবদ্ধ। অশোক চরিত্রের আবির্ভাবে সেই আবদ্ধতা থেকে কিছুটা বের হয়ে আসে।

ছবির নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্যের অন্ত-যোগ চিত্ররূপের দৃশ্যগুণ বাড়িয়ে দেয়। যেমন একটি দৃশ্যে দেখা যায় মিস্টার ব্যানার্জির করা অযাচিত প্রশ্নের জবাবে মনিশা অস্বস্তি বোধ করে। ওই মুহূর্তে মনিশার মনের অস্থিরতা আমাদের মনেও প্রবাহিত হয়। সেই দৃশ্যেই রাস্তার পাশে সৃষ্ট পিতলের অনবরত শব্দ দিয়ে মনিশার অস্বস্তির সাথে দর্শককে যুক্ত করা হয়। এমন দৃশ্য দৃশ্যায়নের পাশাপাশি সংলাপ-ব্যবহারেও পাওয়া যায় মুন্সিয়ানা। যেমন অশোক মনিশাকে বলছে, “৩০০ টাকার চাকরি!  হঠাৎ কি যে হয়ে গেলো? এই জায়গা বলেই বোধহয়, কলকাতা হলে নির্ঘাত নিয়ে নিতুম। ভিক্ষে হোক আর যাই হোক!” তন্মধ্যেই দুই স্থানের চিত্র চোখে ভেসে উঠে— কলকাতা যেন চরম বাস্তবতার রূপ আর কাঞ্চনজঙ্ঘা স্বপ্নপুরী। এই রোদ, এই মেঘ, এই কুয়াশার মধ্যে এসে অশোকের মনে হল সে আর সাধারণ কেউ নয়। সে নায়ক, প্রচন্ড সাহসী কেউ। প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে প্রয়োজনে লড়বে তবু কারো দয়া গ্রহণ করবে না।

3_20160925011319876

কলকাতার নিত্যদিনকার ব্যস্ততা ছেড়ে দার্জিলিংয়ের এই পরিবর্তিত পরিবেশ যেন প্রত্যেকটি চরিত্রের ভাবনাকে ত্বরান্বিত করেছে। পরিচালকের জন্য এই পরিবর্তিত আবহের সাথে চরিত্রের ভাবনার সদৃশতা রাখা ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয়। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ রঙিন ফ্রেমে করা পরিচালকের প্রথম কাজ। পাশাপাশি এটি একটি যৌক্তিক পদক্ষেপও। কারণ প্রকৃতির ধরণ বদলের এমন চিত্র রঙিন ফ্রেম ছাড়া এত সুস্পষ্টভাবে তুলে আনা যেতো না। এমন অনেকভাবেই ছবিটিকে বিশেষায়িত করা যায় । সত্তরের দশকে পশ্চিম বাংলায় সৃষ্ট তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতাকে সত্যজিৎ পরবর্তীতে তাঁর ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৭০) ও ‘সীমাবদ্ধ’ (১৯৭১) এর মতো ছবির মাধ্যমে তুলে এনেছেন। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’কে তিনি দেখেছেন সেইসব ‘রাজনৈতিক ছবি’র পথপ্রদর্শক হিসেবে।

বাঙালি দর্শকের জন্য এমন ‘হাইপারলিংক ছবি’ স্বাভাবিকভাবেই সময় থেকে আধুনিক ছিল। এই টার্মটিকে জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছেন রজার ইবার্ট এবং এর বর্ণনায় তিনি বলেন, “এই ধরনের ছবিতে চরিত্রগুলো পৃথক গল্পে অবস্থান করবে কিন্তু সেসব গল্পের মধ্যে একটি যোগসূত্র থাকবে যা ধীরে ধীরে দর্শকের কাছে প্রকাশ পায়।” যদিও লেখিকা আলিসা কুয়ার্ট মনে করেন পরিচালক রবার্ট অল্টম্যান তার ‘ন্যাশভিল’ (১৯৭৫) ছবির মাধ্যমে এই ধারার গঠন তৈরি করেন কিন্তু ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-ই সম্ভবত এই নির্দিষ্ট ধারার প্রথম উদাহরণ।

4

কুয়াশার অস্পষ্টতা কেটে যায়। প্রকৃতির পরিবর্তিত রূপ সংশয়ের বদলে নির্ভয় দেয়। লাবণ্য দৃঢ়চিত্তে বলে উঠে— “সবই যদি মুখ বুজে সহ্য করি তবে বেঁচে থেকে লাভ কি”?

কাঞ্চনজঙ্ঘা (Kanchenjungha) (1962)
Running time: 102 min ● Release date: 11 May 1962 ● Color: Color ● Country: India ● Language: Bangla ● Genre: Drama ● Producer: Satyajit Ray ● Cinematographer: Subrata Mitra ● Editor: Dulal Dutta ● Music: Satyajit Ray ● Cast: Chhabi Biswas (Indranath Roy), Karuna Bannerjee (Labanya, wife), Anil Chatterjee (Anil, son), Alaknanda Roy (Monisha, unmarried daughter), Anubha Gupta (Anima, elder daughter), Arun Mukherjee (Ashoke, young man from Calcutta), Subrata Sen (Sankar), Sibani Singh (Tuklu), Vidya Sinha (Anil’s girlfriend), Pahari Sanyal (Jagadish), N. Viswanathan ● Writer & Director: Satyajit Ray

এই লেখাটি মূলত প্রকাশিত হয়েছিল ‘মুখ ও মুখোশ’ অনলাইন সিনে ম্যাগাজিনের জন্য। সেই লেখা পড়তে যেতে হবে এই লিংকে

এখানে অবশ্য লেখাটির ‘বর্ধিত সংস্করণ’ প্রকাশিত হয়েছে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s