‘নস্টালজিয়া’ আমার অন্তর্জগৎকে গভীরভাবে মুক্ত করেছেঃ আন্দ্রেই তারকোভস্কি

তখনো ‘নস্টালজিয়া’ ছবি নিয়ে ভাবছেন। যথারীতি ইমেজ দিয়ে পূর্বের ছবি স্টকার-এর চেয়ে আরও কত সহজ ও অত্যাবশ্যক উপায়ে বিষয়বস্তুকে দৃশ্যায়িত করা যায় সেই চিন্তায় বিভোর। একজন মানুষ আর তার চারপাশের জীবনকে দেখানো হবে। তবে অবশ্যই সে বাস্তবের মানুষ। প্রসঙ্গক্রমে একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হয় ‘মিরর’ ছবিতে দেখানো স্বপ্নের বাস্তববাদ নিয়ে। প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘জীবনের এক-তৃতীয়াংশ আমরা ঘুমিয়ে কাটাই (আর তাই স্বপ্ন দেখি), স্বপ্নের চেয়ে বেশি বাস্তব আর কী হতে পারে?’ এই হলেন তারকোভস্কি।

তারকোভস্কি’র চলচ্চিত্র মানেই যেন এক ‘আপেক্ষিক’ বিষয়। একে যে দিকে থেকেই দেখতে চাইবেন তাতে ভাবনার খোরাক জন্ম নিবে। নিজের ছবির ধরণ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তারকোভস্কি বলেন, ‘আমি চিরকালই সহজের ভক্ত’! তাই বলে এই নয় যে বিষয়ের গভীরে যেতে চাই না। কিন্তু একে মানবজীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আনতে হবে, যাতে ছবিটা হৃদয়গ্রাহী হয়। আরও বলেন, ‘আমি উপরিতলে ভেসে না থেকে বরং পৌছতে চেয়েছি গভীরতর ও অস্বস্তিকর দিকগুলোর শেষ পর্যন্ত।’

pic-02

ব্যক্তি তারকোভস্কি এবং তাঁর কাজ নিয়ে সবচেয়ে যথোচিত ব্যাখ্যা সম্ভবত ইঙ্গমার বার্গম্যান দিয়েছেন, ‘তারকোভস্কি আমার মতে শ্রেষ্ঠ (পরিচালক) একজন, যে ছবির প্রকৃত সত্তার সন্ধানে নতুন এক ভাষার উদ্ভাবন করেছে, যা জীবনকে তার ভাবনায় বন্দী করে, স্বপ্নে বন্দী করে।’

‘নস্টালজিয়া’ নিয়ে তিনি তখন ১৯৮৩’এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে। তার ছবি পাম ডি’ওর জেতার দৌড়ে। সেই উৎসবেই মুরিজিও পররো তারকোভস্কি’র এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন।


কান’সঃ তারকোভস্কি
মুরিজিও পররো

ভাষান্তরঃ আরিফ মাহমুদ


মুরিজিও পররো

কি জন্যে নস্টালজিয়া মিস্টার তারকোভস্কি?

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

আমাদের ‘নস্টালজিয়া’ কিন্তু আপনাদের ‘নস্টালজিয়া’ নয়। এটা কেবলই একজন ব্যক্তির আবেগ নয়, বরং আরও বেশি জটিল এবং গভীর যা প্রবাসী রুশ তার অনুভবে উপলব্ধি করে। এটা একটা ব্যাধি, একটা অসুস্থতা, যা তার আত্মার শক্তি, কর্মক্ষমতা, বেঁচে থাকার অানন্দকে গ্রাস করে। এক জমাটবদ্ধ কাহিনীতে ইতালিতে আসা এক সোভিয়েত বুদ্ধিজীবীর মধ্য দিয়ে সমস্যাটির সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমি এই নস্টালজিয়ার ধরণকে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছি।

pic-03

মুরিজিও পররো

ওই স্মৃতিবেদনায় কাতর থেকেও, আমাদের সাথে কাজ করে আপনার কেমন লেগেছে?

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

খুবই ভালো। কারণ যে কোন ক্ষেত্রেই, সর্বত্রই সিনেমা একটা বৃহৎ পরিবারের মতো। আমি ছবিটা কোন অনুবাদক ছাড়াই করেছি। ভাঙ্গা শব্দ জোট দিয়ে নিজের কথাটা বোঝাতে চেয়েছি। চলচ্চিত্র একটা সার্বজনীন ভাষা ব্যবহার করে, যার ফলে আমরা একে অপরকে বুঝতে পারি, নিজেদেরকেও বোঝাতে পারি। ইতালিতে দেখেছি, এই ধরনের ছবি তৈরিতে আর্থিক দিক থেকে অনেক আলোচনা আর তর্ক-বিতর্ক হয়, যা আমরা রাশিয়াতে ততটা জরুরী বলে বিবেচনা করি না।

মুরিজিও পররো

মূল চরিত্রে রাশিয়ান দেখে, যে কেউ এটাকে একটা আত্মজীবনীমূলক ছবি হিসেবে দেখতে প্ররোচিত হতে পারে।

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

তা হতে পারে তবে তা শুধুমাত্র শৈল্পিক দিকে থেকে। বস্তুত, এই অর্থে, এটার মতো করে আমি আর কোনো একটাও ছবি বানাইনি যা আমার মনের অবস্থাকে এমন প্রচন্ডতায় প্রতিফলিত করেছে, আমার অন্তর্জগৎকে এমন গভীরভাবে মুক্ত করে দিয়েছে। আমি নিজে যখন সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া ছবিটা দেখেছিলাম, অভিব্যক্তিপূর্ণ শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই স্তব্ধ হয়েছিলাম। যেন আমি অসুস্থ বোধ করছিলাম। প্রতিবিম্বে তাকিয়ে কেউ যেমনটা অনুভব করে, একদম তেমন । কিংবা কারো নিজস্ব উদ্দেশ্যের গন্ডিকে ছাপিয়ে যে গভীর অনুভূতির সৃষ্টি হয় ঠিক এইরূপ।

pic-04

মুরিজিও পররো

আর আপনার উদ্দেশ্য কি ছিল?

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

ইতালিতে আসা একজন রুশ নিজেকে ঘিরে থাকা অপ্রত্যাশিত আবগকে যেভাবে আবিষ্কার করে, তা সহজভাবে লক্ষ্য করাই আমার ইচ্ছা ছিল। অবশ্যই, একই ব্যাপার যদি আমি আফ্রিকা বা কে জানে অন্য কোথাও গেলেও ঘটতো। এই লোকটা দেশগুলোর মধ্যে প্রতিবন্ধকতার কারণ কি বুঝতে পারে না। এইসব কৃত্রিম নিয়মনীতি যা মানুষকে অপরের থেকে আলাদা করে দিতে চায় সেসবকে সে গ্রহণ করতে রাজি নয়। আর এইসব কিছু স্বাভাবিকভাবেই তার আতঙ্কগ্রস্থ যন্ত্রণাকে প্ররোচিত করে। এমনকি একটি শিশু, যদি তাকেও জিজ্ঞেস করা হয় উত্তরে বলবে আমাদের একে অপরকে আরো ভালোভাবে বোঝা উচিত, উচিত সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়া। অবশ্যই এটা একটা অকপট আর আদর্শবাদী উত্তর, কিন্তু মূলতই তাই। নাটকটা ঠিক জগতের নির্দোষ দৃষ্টি এবং দেশ ছেড়ে আসা এক মানুষের জীবনের বাস্তব অবস্থার সংঘাতের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠে।

মুরিজিও পররো

আপনার কাজ আপনাকে কতটা সাহায্য করে?

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

চলচ্চিত্র হল সবচেয়ে অভিজাত এবং গুরুত্বপূর্ণ এক শিল্প। যদিও এখনো তাকে বানিজ্য ও বাজারের এক পণ্যদ্রব্য হিসেবে আদিপাপ হয়ে জন্মানোর প্রায়শ্চিত্ত দিয়ে যেতে হচ্ছে।

মুরিজিও পররো

আপনার কী মনে হয় না এই সবকিছুই নৈরাশ্যবাদের একেবারে কাছাকাছি?

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

এর ঠিক উল্টো, বরং প্রকৃত নৈরাশ্যবাদীরাই সবসময় সুখের সন্ধান করে চলেছে। দু-তিন বছর অপেক্ষা করুন আর তারপর তাদের কাছে যান এবং জিজ্ঞেস করুন তারা কী পেয়েছে।  

pic-06

মুরিজিও পররো

আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারি, আপনার আশাবাদের শিকড়টা কোথায়?

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

এটা নিহিত আছে একটা অসঙ্গতিপূর্ণ উন্নয়নের উপরে থেকে গড়ে উঠা আমাদের সভ্যতার নাটকে অবহিত থাকার মধ্য দিয়ে। প্রযুক্তি আর আত্মার চাহিদার মধ্যে পরিপূর্ণতাই হল জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

এই লেখাটি মূলত প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাংলামেইল২৪ ডট কম’ অনলাইন পত্রিকার জন্য। সেই লেখা পড়তে যেতে হবে এই লিংকে 

মুরিজিও পররো ১৬ মে ১৯৮৩ইং তারিখে কান চলচ্চিত্র উৎসবে তারকোভস্কির এই সাক্ষাৎকারটি নেন। সেই সাক্ষাৎকারটি নস্টালজিয়া ডট কম থেকে ভাষান্তর করা হয়েছে। সেটি পড়তে যেতে হবে এই লিংকে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s