সূর্য কন্যা – দাসত্বের বেড়াজাল ভাঙবে কেবল ভালোবাসায়

surja_kanya11-medium

ভালোবাসা কি অনন্তকালের হয়? কেউ বলে ভালোবাসা দৃশ্যমান আবার কারো কাছে অদৃশ্য। মনকে রাঙিয়ে দেয় তবু নাকি এর কোন রঙ নেই! ভালোবাসার সংজ্ঞা দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়, বরং কালাতিক্রমের ভালোবাসায় এ চলচ্চিত্রে ইতিহাসের কোন অবস্থানের ব্যাখ্যা প্রতীয়মান হয় তা সূচিত করা।

ইতিহাস ফিরে নৃ-তত্ত্ববিদদের গবেষণা থেকে জানা যায় একটা সময় পর্যন্ত পরিবার ব্যবস্থা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। প্রতিটি গোত্র তখন একজন গোত্রপ্রধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত এবং এই গোত্রের প্রধান হতেন একজন নারী। শুরুতে উৎপাদনের নাটাই ছিল নারীর হাতে শ্রম বিভাজনের সূত্রপাতে নিয়ন্ত্রণ যায় পুরুষের হাতে। এ প্রক্রিয়ায় নারীর অবস্থানের পরাজয়ে সভ্যতম সভ্যতার সৃষ্টি হয় নারীর দাসত্বের মধ্য দিয়ে। সেই দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসা এক চরিত্র সূর্য কন্যা।

সেই দাসত্বের বেড়াজাল ভাঙবে কেবল ভালোবাসায়। অনন্তকালের ভালোবাসায়। নীল যেমন ভালোবাসে শরতের মেঘকে, সবুজ যেমন বসন্তকে তেমনি নিবিড় করে বিলীন হয়ে।

unnamed

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া ‘লেনিন’ তার পরিবারের অপর্যাপ্ততাকে যেমন জানে; তেমনি শত কষ্টের মাঝেও তার স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিতে রাজি নয়। নিজের রাজনৈতিক সত্তাকে জাগিয়ে সমাজের সব অনিয়ম ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলতে চায়। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে অবগত। আত্মসম্মানবোধের গরিমা রয়েছে আবার বাস্তবতাজ্ঞান সম্পন্নও। এ যেন চেনা সমাজের চেনা মানসিক আদলে গড়া কোন চরিত্র। আর রয়েছে সূর্যকন্যার জন্যে কালের শেষ পর্যন্ত প্রতীক্ষা করা ভালোবাসা।

১৯৭৫ সালে নির্মিত ‘সূর্যকন্যা’ চলচ্চিত্র পরিচালনায় আলমগীর কবিরের দ্বিতীয় পদক্ষেপ। এতে সূর্য কন্যাকে তিনি দিয়েছেন মূর্তিরূপ, লেনিনের কামনাহীন ভালোবাসায় যার মধ্যে প্রাণসঞ্চার হয়– এটি রূপক অর্থেই ব্যবহৃত। আদতে তিনি কালের অন্ধকার হতে নারীকে তার উপযুক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনার পন্থা বাতলে দিয়েছেন। পরিপ্রেক্ষিতে লেনিন চরিত্রটি ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ। সেটি কেন– আশা করি এর উত্তর ইতোমধ্যে আপনি পেয়ে গেছেন।

ছবিতে লেনিন চরিত্রের পরস্পরবিরোধী সত্তা পরিচালক কয়েকটি দৃশ্যের আদলে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন, লেনিনের কেরানি বাবা যখন তার বেকারত্ব নিয়ে গালমন্দ করে তখন আমরা দেখি লেনিন কল্পনায় চলে যায়। কল্পনায় সে আর বেকার চিত্রশিল্পী নয়, তার পেইন্টিং সেখানে বিক্রি হচ্ছে। উপার্জিত সেই টাকা দেখিয়ে বাবাকে সে উপযুক্ত জবাব দেয়। একইভাবে, এক পথচারীর ছিনতাই হয়ে যাওয়া দেখেও বাস্তবে সে কিছুই করতে পারে না। কিন্তু কল্পনায় ছিনতাইকারীকে নাস্তানাবুদ করে পথচারীর টাকা ঠিকই ফিরিয়ে দেয়।

আলমগীর কবিরের বর্ণনায়, “কলমের খোঁচায় বা ছবি এঁকে যদি এই অসম সমাজব্যবস্থার একটা বিহিত করা যেতো তাহলে লেনিন আজই তা করে দিত। কিন্তু যেহেতু বিপ্লব ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়, সেহেতু সে ঝামেলা এড়িয়ে কল্পনার রাজ্যে পালিয়ে বেড়ায়।” কল্পনার রাজ্যে তার বাস্তবের অপ্রাপ্তিগুলো পূর্ণতা পায়। যেখানে নারীমুক্তির আকাঙ্ক্ষা আছে, সমাজকে বদলে দেয়ার চিন্তা আছে। লেনিন চরিত্রের সংকটে যদি আপনি গভীর চোখ ফেলেন তবে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৭০) ছবির সিদ্ধার্থের সাথে এর সদৃশতা খুঁজে পাবেন।

পুরো ছবি লেনিনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো। সূর্যকন্যার জীবন্ত রূপ তার কল্পনার সৃষ্টি। বোধ করি তাই সূর্যকন্যার পরিণতি লেনিনের মধ্যবিত্ত বাস্তবতায় বন্দী হয়ে যায়।

maxresdefault

ছবির অন্য চরিত্র ‘রাসেল’ যেন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে লেনিনের অপর মেরুতে অবস্থান করে। উচ্চবিত্ত শ্রেণীর রাসেলের মধ্যে কল্পনাপ্রবণতা নেই। সে বাস্তববাদী। বিদেশে থাকায় স্বভাবে ও মানসিকতায় স্পষ্ট বিদেশী ছাপ। তথাকথিত সম্পর্কের বন্ধনে সে আটকে থাকতে চায় না। তাই ‘মনিকা’র সাথে শারীরিক প্রেমে তার দ্বিধা নেই কিন্তু বিয়ের প্রশ্নে অনিচ্ছুক। অথচ তার চরিত্রের পরিব্যাপ্তিতে তাকে কেবল ভোগবাদী পরিচয়েও আটকে রাখা যায় না। এভাবে সমাজের ভিন্ন চিন্তার দুই চরিত্রের সহাবস্থান দেখিয়ে ছবিটি বিন্যস্ত হয়েছে।

সত্তর দশকের অধিক সমাদৃত এবং শ্রবণপ্রিয় দুটি গান এ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত। সত্য সাহার সুরে ফজল শাহাবুদ্দিনের কথায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আমি যে আঁধারের বন্দিনী’ গানটি যেন পুরো গল্পের সারসংক্ষেপ। এ যেন বন্দিনীর আকাশ কালো তৃষিত হৃদয়ের আলোয় ফেরার ব্যগ্রতা। শ্যামল মিত্রের গাওয়া ‘চেনা চেনা লাগে’ গানটিকে নিশ্চয়ই অনুরক্ত-হৃদয়ের কাউকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না।

প্রসঙ্গ যখন বাংলা চলচ্চিত্র তখন স্বাভাবিকভাবেই সর্বাগ্রে সত্যজিত রায়, ঋত্বিক কুমার ঘটক, মৃণাল সেনের নাম আসবে। না, প্রসঙ্গ টানার মানেই এই নয় যে আলমগীর কবিরকে এক পরিসরে আনা কিংবা বলছিনা তাদের চলচ্চিত্র-প্রজ্ঞা বা নির্মাণ শৈলী এক। তবে একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যে এদেরকে এক বন্ধনীতে আবদ্ধ করতে হয়, তা হলো– চলচ্চিত্রে তাদের রুচিবোধ।

সেই বোধ থেকে বেরিয়ে আসা একটি চলচ্চিত্র– সূর্যকন্যা।

সূর্য কন্যা (Daughter of the Sun) (1975)
Running time: 108 min ● Color: Black & White ● Country: Bangladesh/India ● Language: Bangla ● Genre: Drama ● Producer: Alamgir Pictures Ltd. ● Cinematographer: M. A. Mobin ● Editor: Debabrata Sengupta ● Music: Satya Saha ● Story, Screenplay & Dialogue: Alamgir Kabir ● Cast: Bulbul Ahmed, Rajashree Bose, Jayashree Roy, Ahsan Ali, Ajay Banerjee, Sumita Debi ● Director: Alamgir Kabir

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s